
হঠাৎ চোখের পাতা কাঁপছে, পায়ের পেশিতে টান পড়ছে বা বিশ্রামের মাঝেও হাত–পায়ে অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠছে এমন অভিজ্ঞতা কি কখনো হইয়েছে? অনেকেই এসব লক্ষণ দেখলে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। মনে হয়, বড় কোনও রোগের ইঙ্গিত কি না! কিন্তু বাস্তবতা হলো শরীরজুড়ে হঠাৎ পেশি কাঁপা বা টুইচিংয়ের বেশিরভাগ কারণই ক্ষতিকর নয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়াও জরুরি। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে চিকিৎসকরা এ বিষয়ে কথা বলেছেন। উঠে এসেছে কেন এমন হয় আর কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া প্রয়োজন।
পেশি কাঁপার সাধারণ কারণ
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় পেশি কাঁপাকে বলা হয় ফ্যাসিকুলেশন। এটি পেশির খুব ছোট, অনিচ্ছাকৃত সংকোচন, যা ত্বকের নিচে হালকা লাফানো, কাঁপুনি বা ঢেউয়ের মতো মনে হয়। চোখের পাতা, পা, হাত, বাহু, এমনকি জিহ্বাতেও হতে পারে। এমন ঘটে যখন কোনও নির্দিষ্ট স্নায়ু হঠাৎ সক্রিয় হয়ে যায়। বেশিরভাগ সময়ই এটি শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। বিভিন্ন কারণেই পেশি কাঁপতে পারে। এগুলো হলো:
১. মানসিক চাপ ও উদ্বেগ
অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা টেনশন শরীরে অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোন বাড়িয়ে দেয়। ফলে স্নায়ু অতিসংবেদনশীল হয়ে পড়ে এবং পেশি কাঁপতে শুরু করে। চাপ কমলে সাধারণত সমস্যাও কমে যায়।
২. অতিরিক্ত ক্যাফেইন
বেশি চা, কফি বা এনার্জি ড্রিংক স্নায়ুকে অতিরিক্ত উত্তেজিত করে তোলে। এতে চোখ, হাত বা পায়ের পেশি কাঁপতে পারে। ক্যাফেইন কমালে ২–৩ দিনের মধ্যেই উপশম হয়।
৩. ঘুমের অভাব ও ক্লান্তি
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে স্নায়ু ও পেশি ঠিকভাবে বিশ্রাম পায় না। ফলে এলোমেলো কাঁপুনি দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে মুখ, হাত ও পায়ে।
৪. অতিরিক্ত ব্যায়াম বা পেশির অতিব্যবহার
ভারী ব্যায়াম বা দীর্ঘ সময় শারীরিক পরিশ্রম করলে পেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ে, ল্যাকটিক অ্যাসিড জমে এবং সাময়িক স্নায়ু উত্তেজনা তৈরি হয়। বিশ্রাম নিলে সাধারণত ঠিক হয়ে যায়।
৫. পানিশূন্যতা ও ইলেকট্রোলাইটের ঘাটতি
পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম, ডায়রিয়া বা বমির কারণে শরীরে সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট হয়। এতে পেশি কাঁপা ও খিঁচুনি হতে পারে।
৬. পুষ্টির ঘাটতি
বিশেষ করে ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি ও ভিটামিন বি১২-এর অভাব পেশি কাঁপার অন্যতম কারণ।
বেনাইন ফ্যাসিকুলেশন সিনড্রোমকী
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সপ্তাহ বা মাসজুড়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় বারবার পেশি কাঁপতে থাকে, যদিও তারা খুব বেশি চাপ বা ক্লান্তিতে নেই। একে বলা হয় বেনাইন ফ্যাসিকুলেশন সিনড্রোম (বিএফএস)। এটি কোনও ভয়ংকর স্নায়ুরোগ নয়, জীবনহানিকরও নয়। তবে অনেকে এটিকে মারাত্মক রোগ ভেবে মানসিক দুশ্চিন্তায় ভোগেন। বাস্তবে বিএফএস রোগীদের পেশির শক্তি স্বাভাবিকই থাকে।
কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন
পেশি কাঁপা সাধারণত স্বাভাবিক হলেও নিচের লক্ষণগুলো থাকলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান—
কাঁপার সঙ্গে পেশির দুর্বলতা দেখা দিলে
পেশির আকার ছোট হয়ে যেতে থাকলে
কাঁপুনি শরীরের এক জায়গায় সীমাবদ্ধ থেকে ক্রমশ বাড়তে থাকলে
জিহ্বায় দীর্ঘদিন ধরে কাঁপুনি থাকলে
বিশ্রাম, ঘুম ও ক্যাফেইন কমালেও কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে সমস্যা না কমলে
প্রয়োজনে চিকিৎসক রক্ত পরীক্ষা, ভিটামিন ও ইলেকট্রোলাইট টেস্ট কিংবা ইএমজি করার পরামর্শ দিতে পারেন।
হঠাৎ শরীরজুড়ে পেশি কাঁপা মানেই ভয়ংকর কিছু নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি আমাদের ব্যস্ত জীবন, ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ বা খাদ্যাভ্যাসেরই ফল। পর্যাপ্ত পানি পান, ভালো ঘুম, ক্যাফেইন কমানো ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করলেই অনেক সময় সমস্যা দূর হয়ে যায়। তবে শরীর যদি বারবার সতর্ক সংকেত দেয়, সেটিকে অবহেলা না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়াই ভালো।
স্টাফ রিপোর্টার 









