টাঙ্গাইল দেলদুয়ারে বাবুপুর গ্রামবাসী চাঁ*দা তুলে ষাট শতাংশ জায়গা কিনে শি*শু-কিশোরদের খেলার… more

টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে গ্রামবাসীর ব্যতিক্রমী উদ্যোগ, চাঁদা তুলে ৬০ শতাংশ জমি কিনে শিশু-কিশোরদের জন্য তৈরি করলেন খেলার মাঠ!
গ্রামের শিশু-কিশোরদের মুখে হাসি ফোটাতে এবং তরুণ প্রজন্মকে সুস্থ বিনোদনের সুযোগ করে দিতে এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার বাবুপুর গ্রামের বাসিন্দারা। সরকারি কোনো সহায়তার অপেক্ষায় না থেকে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী টাকা তুলে শিশু-কিশোরদের জন্য স্থায়ী খেলার মাঠের জমি কিনেছেন তাঁরা। গ্রামবাসীর এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ইতোমধ্যে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।

জানা গেছে, দেলদুয়ার উপজেলার দেউলী ইউনিয়নের বাবুপুর গ্রামে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের বসবাস। গ্রামটিতে রয়েছে ৭০০টিরও বেশি পরিবার। এত মানুষের বসবাস থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে শিশু-কিশোর ও তরুণদের খেলাধুলার জন্য নির্দিষ্ট কোনো মাঠ ছিল না। ফলে গ্রামের ছেলেমেয়েদের খেলাধুলা করতে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হতো।

ধান কাটার মৌসুমে কৃষিজমি ফাঁকা হলে শিশুরা সেখানে ফুটবলসহ বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা করত। কিন্তু জমিতে নতুন করে ফসলের আবাদ শুরু হলেই বন্ধ হয়ে যেত তাদের খেলার সুযোগ। এভাবে বছরের বেশিরভাগ সময়ই খেলাধুলা থেকে বঞ্চিত থাকত গ্রামের নতুন প্রজন্ম।

এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেন গ্রামের সন্তান এস এম ইকবাল মাহমুদ এবং ক্রীড়াব্যক্তিত্ব খোরশেদ আলম। তাঁরা গ্রামের মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে একটি স্থায়ী খেলার মাঠ তৈরির পরিকল্পনা করেন। পরে গত ৮ সেপ্টেম্বর গ্রামবাসীদের নিয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সবাই সম্মিলিতভাবে জমি কেনার সিদ্ধান্ত নেন।

এরপর শুরু হয় অর্থ সংগ্রহের কার্যক্রম। গ্রামের ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। কেউ ২০০ টাকা, কেউ ৫০০ টাকা, কেউ এক হাজার টাকা দিয়েছেন। আবার সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা দুই হাজার, পাঁচ হাজার এমনকি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অনুদান দিয়েছেন।

সবাই মিলে অর্থ সংগ্রহ করে গ্রামের বাসিন্দা ইকবাল হোসেন সুজনের কাছ থেকে ৬০ শতাংশ জমি কেনা হয়। প্রতি শতাংশ জমির মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৫২ হাজার টাকা। জমির মালিকও এই মহৎ উদ্যোগে সহযোগিতা করে এক শতাংশ জমি দান করেন। বাকি ৫৯ শতাংশ জমির জন্য ৩০ লাখ ৬৮ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়।

গত ২৯ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে জমিটি গ্রামবাসীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ উপলক্ষে গ্রামে তৈরি হয় আনন্দঘন পরিবেশ। বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে বিভিন্ন বয়সের মানুষ মাঠে উপস্থিত হন। জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে নতুন খেলার মাঠের উদ্বোধন করা হয়। উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন গ্রামের তরুণরা।

দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় আনন্দে আত্মহারা গ্রামের শিশু-কিশোরেরাও। তাদের প্রত্যাশা, এখন থেকে আর ফসলের জমি ফাঁকা হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হবে না। নিজেদের মাঠে সারা বছর ফুটবল, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলাধুলা করতে পারবে তারা।

তবে এই উদ্যোগের গল্প এখানেই শেষ নয়। গ্রামবাসীর এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর সরকারের নজরেও এসেছে বিষয়টি। মাঠ সম্প্রসারণের জন্য অতিরিক্ত জমি কেনার ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তার উদ্যোগের কথাও জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে মাঠের বাকি জমি কেনার জন্য প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।

প্রথম আলো+1

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পর্যাপ্ত জমি নিয়ে একটি সুন্দর ও আধুনিক খেলার মাঠ গড়ে উঠলে এখান থেকেই ভবিষ্যতে ভালো মানের খেলোয়াড় তৈরি হবে। পাশাপাশি শিশু-কিশোর ও তরুণদের খেলাধুলায় আগ্রহ বাড়বে এবং তারা মাদকসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ থেকে দূরে থাকার সুযোগ পাবে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, বাবুপুর গ্রামের মানুষ দেখিয়ে দিয়েছেন, সবাই একসঙ্গে উদ্যোগ নিলে নিজেদের এলাকার দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান নিজেরাই করতে পারেন। কারও কাছে বড় অঙ্কের অর্থ ছিল, কারও সামর্থ্য ছিল মাত্র ২০০ টাকা। কিন্তু সবার লক্ষ্য ছিল একটাই—নিজেদের সন্তানদের জন্য একটি খেলার মাঠ তৈরি করা।

বাবুপুর গ্রামের এই ঘটনা শুধু একটি মাঠ কেনার গল্প নয়; এটি সামাজিক ঐক্য, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য উদাহরণ। দেশের অন্যান্য গ্রামেও যদি এভাবে সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে হারিয়ে যেতে বসা খেলার মাঠ ও গ্রামীণ খেলাধুলার পরিবেশ আবারও ফিরে আসতে পারে।

Author: Janatar Barta

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *