দেশজুড়ে গ্যাসের সংকট নিয়ে যখন সাধারণ মানুষ, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তখন সংকট কতদিন স্থায়ী হতে পারে সে বিষয়ে সময়সীমা জানিয়েছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
২০২৬ সালের ২৭ জুলাই রাজধানীতে আয়োজিত একটি গোলটেবিল বৈঠকে তিনি জানিয়েছিলেন, দেশের চলমান গ্যাস সংকট স্বাভাবিক হতে আরও ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুনের ঘটনায় গ্যাস খালাসে বিঘ্ন ঘটায় তখন সংকট তীব্র হয়ে উঠেছিল।
কেন তৈরি হয়েছিল গ্যাসের সংকট?
দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় এলএনজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালের মাধ্যমে পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
জুলাইয়ে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুনের ঘটনার কারণে গ্যাস খালাস ও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। এর প্রভাব পড়ে বিভিন্ন খাতে। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ তৈরি হয়।
পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন মন্ত্রী
পরবর্তী সময়ে ৬ আগস্ট ২০২৬-এ জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, একটি এফএসআরইউর কারিগরি ত্রুটি মেরামত করে কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়েছে। তখন তিনি বলেছিলেন, দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসবে এবং ধীরে ধীরে গ্যাসের চাপ বাড়বে।
গ্যাসের সাময়িক সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হয়েছিল বলে তিনি জানান। কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাসের অভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং দেখা দিয়েছিল।
গ্যাসের দীর্ঘমেয়াদি সংকট নিয়ে কী বলছে সরকার?
শুধু সাময়িক সরবরাহ সমস্যা নয়, দেশে গ্যাসের দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান নিয়েও সরকার কাজ করছে।
৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, দেশে বছরে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট, বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি জানান, দেশে গ্যাসের চাহিদা বছরে প্রায় ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য রয়েছে বলে সংসদে জানানো হয়। এ জন্য নতুন কূপ খনন, পুরোনো কূপে ওয়ার্কওভার, সিসমিক জরিপ এবং সমুদ্রভিত্তিক গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এলএনজি আমদানিতেও নেওয়া হয়েছে উদ্যোগ
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর ও নভেম্বর ২০২৬—এই দুই মাসে দেশে মোট ১৯ কার্গো এলএনজি আমদানি নিশ্চিত করেছে পেট্রোবাংলা। এর মধ্যে অক্টোবরে ১০টি এবং নভেম্বরে ৯টি কার্গো আসার কথা রয়েছে। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, এসব কার্গো দেশে আসার পর টার্মিনালের মাধ্যমে পুনঃগ্যাসীকরণ করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, এসব এলএনজির একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় এবং কিছু কার্গো স্পট মার্কেট থেকেও আনা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, নাইজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন উৎস থেকে এলএনজি কেনা হয়েছে।
এখন পরিস্থিতি কী?
জুলাইয়ে মন্ত্রী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা জানিয়েছিলেন। এরপর আগস্টে তিনি দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার কথা জানান। সর্বশেষ ২৭ সেপ্টেম্বর জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, দুর্যোগের পরিস্থিতি কাটিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ঠিক হয়ে আসছে এবং কোনো নতুন দুর্ঘটনা না ঘটলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ সঠিকভাবে চলবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশের গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান একটি বড় বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। এ কারণে শুধু সাময়িক সংকট কাটানো নয়, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো এবং এলএনজি আমদানির সক্ষমতা ধরে রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ছবিতে ব্যবহৃত “দেশে গ্যাসের সংকট আর কতদিন থাকবে”—এই প্রশ্নের সময়কার জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী ১০ থেকে ১৫ দিনের কথা বলেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সরবরাহ পরিস্থিতির আরও উন্নতির কথা জানানো হয়েছে। তবে দেশে গ্যাসের দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ