নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশন ঘিরে বাংলাদেশের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তি নিয়ে আয়োজিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে ড. ইউনূসের ভাবনা ও উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। অনুষ্ঠানে তাঁর ‘থ্রি জিরো’ বা ‘তিন শূন্য’ ধারণা, তরুণদের ভূমিকা এবং সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবিলার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য, বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সামাজিক ব্যবসা, যুবসমাজ ও প্রযুক্তি বিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাজ ও চিন্তাধারা বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। জাতিসংঘের অফিসিয়াল নথিতে অনুষ্ঠানটির বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে।
ড. ইউনূস দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ব্যবসাকে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব মোকাবিলার একটি বিকল্প পথ হিসেবে তুলে ধরে আসছেন। তাঁর আলোচিত ‘থ্রি জিরো’ ধারণার মধ্যে রয়েছে—শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ, দারিদ্র্য দূর করার লক্ষ্যে সম্পদ কেন্দ্রীভবন শূন্যের দিকে নিয়ে যাওয়া এবং উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে বেকারত্ব শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য। জাতিসংঘের অনুষ্ঠানে এই ধারণাকে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টিও উঠে আসে।
বিশেষ করে তরুণদের নিয়ে ড. ইউনূসের দীর্ঘদিনের কাজ ও সামাজিক ব্যবসার ধারণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জাতিসংঘের অনুষ্ঠানে বলা হয়, তরুণদের শুধু বিভিন্ন কর্মসূচির অংশগ্রহণকারী হিসেবে নয়, বরং নীতিনির্ধারণ, উদ্যোগ গ্রহণ এবং বাস্তব পরিবর্তন তৈরির নেতৃত্বে নিয়ে আসা প্রয়োজন।
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের এবারের মূল ভাবনার সঙ্গেও এসব বিষয় ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। অধিবেশনের সভাপতির ঘোষিত থিম হলো—‘Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations that Delivers for All’ অর্থাৎ আস্থা পুনর্গঠন ও পরিবর্তন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এমন একটি জাতিসংঘ গড়ে তোলা, যা সবার জন্য কার্যকর ফল দিতে পারে।
এদিকে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের বিভিন্ন পর্যায়ে শান্তি, সংঘাত, জলবায়ু সংকট, বৈষম্য, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এবং মানবিক সংকট নিয়েও আলোচনা হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২২ সেপ্টেম্বর সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী বক্তব্যে বিশ্বের বিভিন্ন সংকট, গাজা, ইউক্রেন, সুদান, মিয়ানমারসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সংঘাত এবং রোহিঙ্গা সংকটের বিষয় উঠে আসে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতি ও তাঁর সামাজিক ব্যবসার ধারণা নিয়ে আলোচনা বাংলাদেশের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুদ্রঋণ, উদ্যোক্তা তৈরি এবং সামাজিক ব্যবসা নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের কাজ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে পরিচিত।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্টে “জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের মূল মঞ্চে ড. ইউনূস বক্তব্য দিয়েছেন”—এমন দাবি দেখা গেলেও বিষয়টি উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। জাতিসংঘের অফিসিয়াল নথিতে নিশ্চিতভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামাজিক ব্যবসা, যুব ও প্রযুক্তি বিষয়ক অনুষ্ঠানে ড. ইউনূসকে কেন্দ্র করে বক্তব্য ও আলোচনা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশন ঘিরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সামাজিক ব্যবসা, তরুণদের ক্ষমতায়ন এবং ‘থ্রি জিরো’ ধারণা আন্তর্জাতিক আলোচনায় আবারও সামনে এসেছে। বিশ্বজুড়ে যখন দারিদ্র্য, বেকারত্ব, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রযুক্তিগত বৈষম্যের মতো চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধানের ধারণাটি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।